গত সপ্তাহে ব্যবসায়ীরা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ডিমের দাম বাড়তে পারে। যে কোন মুহূর্তে আকাশ ছুঁতে পারে। আকাশ ঠিকই ছুঁয়েছে। তবে এর জন্য এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগেনি। সাড়ে ৮শ’ টাকার প্রতি ১শ’ ডিম এখন খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১০০০ টাকায়। একমাস আগে ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকার মধ্যে ছিল প্রতি শ’। এক মাসের ব্যবধানে ডিম প্রতি ১শ’তে বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকার মতো। আর এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই হার দেড়শ’ টাকার মতো। বাজারে প্রতি হালিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়ে ঠেকেছে ৪০ টাকায়। হঠাৎ করে এত বেশি দাম বেড়ে যাওয়ায় বাজারে প্রভাব পড়েছে। বিক্রি কমে গেছে অস্বাভাবিক হারে। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার; সর্বত্র কেনাবেচা কম। দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা। বাজারজুড়ে বিরাজ করছে অস্থিরতা। তেজগাঁও ডিমের আড়তের ইসলামপুর পোল্ট্রি ফার্মের মিজানুর রহমান বলেন, গত দুদিনে বিক্রি করেছি ৩০০ ডিম। অথচ এই সময় অন্তত ৫,০০০ বিক্রির কথা। দাম বাড়ায় বিক্রি কমে গেছে। একই অভিমত খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীদের। তারা জানান, গেল সপ্তাহে হালি ছিল ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। আর এখন পাইকারি বাজারেও ওই দামে মিলছে না। বাজারে দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে আড়তের বাবুল ট্রেডার্সের বাবুল সরকার বলেন, চাহিদা আছে কিন্তু যোগান কম। তাই দাম বেশি। পোল্ট্রি ফার্ম বা খামার থেকে পর্যাপ্ত ডিম আসছে না। মুরগির স্বল্পতায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। আবার গরমের মওসুম হওয়ায় দ্রুত নষ্টও হচ্ছে। মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিদিন তার প্রায় ৪০০ ডিম নষ্ট হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, বেশি নষ্ট হয় হাঁসের ডিম। কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ হাওর অঞ্চল থেকে হাঁসের ডিম সংগ্রহ করা হয় বলে সময় বেশি যায়। আর তা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে লেগে যায় ১ সপ্তাহেরও বেশি। সাধারণত ৬ থেকে ৮ দিনের বেশি ভাল থাকে না। ফলে অনেক সময় আড়তেই নষ্ট হয়ে যায়। একারণে ডিমের সঙ্কট আরও বড় হচ্ছে। ভূমিকা রাখছে দাম বাড়তে। পাইকারি বাজারে প্রতি এক শ’ বিক্রি হচ্ছে ৮৯০ থেকে ৯০০ টাকা। গত দুদিন আগে ৯২০ থেকে ৯৪০ টাকাও বিক্রি হয়েছিল। ব্যবসায়ীদের মতে, আড়তে নয়, খামারেই দাম বাড়িয়ে ডিম বাজারে ছাড়া হয়। তাই দাম বাড়লে পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের কিছু করার থাকে না। অপরদিকে খামার মালিকরা বলছেন, বাচ্চার অস্বাভাবিক দাম, চিকিৎসা, রক্ষণাবেক্ষণ- সব মিলিয়ে ব্যয় আগের চেয়ে বেশি। তাছাড়া বার্ড ফ্লুর কারণে বিভিন্ন সময় ধ্বংস করা হচ্ছে অসংখ্য মুরগি। খামারিরা লোকসান ঠেকাতে বাধ্য হয়ে বাড়াচ্ছেন মুরগি ও ডিমের দাম। গাজীপুরের মির্জাপুরে অবস্থিত সানমুন পোল্ট্রি ফার্মের আবদুল মতিন বলেন, খামারিরা লোকসান গুনছেন। গত ২ মাস আগেও আমার আশপাশে অন্তত ৪০টি ফার্ম ছিল এখন সেখানে আছে ৫টি। আশপাশের মধ্যে কাপাসিয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর, মাওনা চৌরাস্তায় থাকা অনেক ফার্ম অব্যাহত লোকসানে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই আগের মতো ডিমের উৎপাদন হচ্ছে না। আমার নিজের খামারেও উৎপাদন এখন আগের তুলনায় অনেক কম। ২ মাস আগে প্রতিদিন ৮০,০০০ ডিম সরবরাহ করতে পারতাম। এখন সেটা নেমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে। ৪০,০০০ এর বেশি ডিম ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিতে পারছি না। এর কারণ ওই সময় ৭০,০০০ মুরগি ছিল আর এখন আছে ৩৫,০০০ মুরগি। এ অবস্থায় এখন অনেক কম খামার যেমন আছে তেমনি উৎপাদনও হচ্ছে কম। কিন্তু চাহিদা কমেনি। বরং বেড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়েছে। তিনি বাজারে ডিমের সঙ্কট ও দাম বাড়ার পেছনে দায়ী করেন বার্ড-ফ্লু আতঙ্ককে। ফ্লু সন্দেহে নির্বিচারে মুরগি নিধনের জন্য অন্যতম দায়ী বলে তার অভিমত। আমার খামারেই ৬ মাস আগে ৩০,০০০ মুরগি মেরে পুঁতে ফেলতে হয়েছে। এতে অন্তত দেড় কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছি। ব্যবসায়ীরা নিশ্চয় এই ক্ষতি পোষাণোর চেষ্টা করবেন। তা না করলে এই খাতে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, ফ্লু’র ভয়ে অনেক খামারি ইতিমধ্যে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে নিশ্চিত হুমকির মুখে আছে এই খাত। এভাবে খামার বন্ধ থাকা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ডিমের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখন কল্পনাতীত। তেজগাঁওয়ের আড়ৎ ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর এখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ ডিম আসতো। এখন আসছে ১০,০০০। এখানে প্রতি সন্ধ্যায় ৭০ থেকে ৮০টি ট্রাক বোঝাই করে ডিম আনা হতো। আর সেই পাইকারি বাজারে ট্রাক আসছে ৪০টির মতো। এভাবে হ্রাম পাচ্ছে সব কিছুই। ফলে দাম বাড়ছে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন